Call: +88 (02) 9353633

 

আসুন ডিমেনশিয়া বান্ধব সমাজ গড়ি

আপডেট: ০৩:০৮, অক্টোবর ২২, ২০১৫
 

৬ অক্টোবর ২০১৫, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘আসুন ডিমেনশিয়া-বান্ধব সমাজ গড়ি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে ছাপা হলো।

ডিমেনশিয়া রোগীর জন্য অবহেলা নয়, চাই ভালোবাসাআলঝেইমারসহ অনেক রোগের একটি সাধারণ উপসর্গ হলো ডিমেনশিয়া। সাধারণত বয়োজ্যেষ্ঠদের এ রোগ হয়। ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া, কোনো কিছু চিন্তা করতে না পারা, কিছু বলতে গিয়ে শব্দ খঁুজে না পাওয়া, পিরচিতদের চিনতে না পারা, ব্যক্তিত্ব ও মেজাজের পরিবর্তন ঘটা ইত্যাদি। আসুন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশে দঁাড়াই।

* বিশ্ব আলঝেইমারস প্রতিবেদন ২০১৫ মতে, ডিমেনশিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সমস্যাকে তীব্রতর করছে
*২০১৫ সালে বিশ্বে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় পঁাচ কোটি
* ২০৩০ সালে এ সংখ্যা হবে সাত কোটির বেশি
* এখন বাংলাদেশে প্রায় চার লাখ ডিমেনশিয়া রোগী রয়েছেন
* ২০৩০ সালে আমাদের দেশে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে যাবে
* সঠিক সেবা ও আদর ভালোবাসাই পারে ডিমেনশিয়া রোগীকে শারীরিক ও মানসিক শান্তি দিতে
* সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি
সূত্র: স্যার ইউলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন

আলোচনায় সুপারিশ
* ডিমেনশিয়াকে স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া জরুরি
* জেরিয়াট্রিক চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক বাড়াতে হবে
* ডিমেনশিয়া সম্পর্কে মানুষকে জানানো ও সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
* স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেন ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়
* পাঠ্যসূচিতে ডিমেনশিয়া রোগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি
* প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। তাই এ ক্ষেত্রে এখনই একটি আইন পাস করে নেওয়া জরুরি

 

সহযোগিতায়:  স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন

 

কার্যালয়: ৫২/১ রাশেদ খান মেনন রোড (নিউ ইস্কাটন রোড), হাসান হোল্ডিংস, সপ্তম তলা, ঢাকা ১০০০,: হেলপ লাইন: ০১৭৩৩২২২৯৯৯
ওয়েব: www.dementiabangladesh.org

আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম: বাংলাদেশে গড় আয়ু এখন ৭০ বছরের ওপরে। ভবিষ্যতে দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষেরা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হন। তবে কম বয়সেও এটা হতে পারে। ডিমেনশিয়া কোনো রোগ নয়, রোগের লক্ষণ। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কিছু মনে রাখতে পারেন না, আপনজনকেও চিনতে পারেন না, সহজে রেগে যান, অনেকের সন্দেহ বাতিক দেখা দেয়।
কারও ডিমেনশিয়া হলে তাঁর প্রতি পরিবারের সবার যত্নশীল হতে হবে। অবহেলা করা বা দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না। নিবিড় সাহচর্য ছাড়া ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে দেশের মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন এ বিষয়ে আলোচনা করবেন জীবন কানাই দাস।

জীবন কানাই দাস:
জীবন কানাই দাসবাংলাদেশের এখন গড় আয়ু ৭০ বছরের ওপরে। এ ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়ে আমরা যে উন্নয়ন করেছি, ভারত-পাকিস্তান এটা পারেনি। আমাদের গড় আয়ু উন্নয়নের অগ্রগতি কেবল জাপানের সঙ্গে তুলনীয়। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করে। আমাদের একটি সেন্টার ফর স্ট্রোক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ফিজিওথেরাপি ও ডিমেনশিয়া কেয়ার সেন্টার আছে। আমরা বাসায় গিয়ে রোগীদের সেবা দিই। এভাবে ডিমেনশিয়া রোগীদের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটে।
সর্বস্তরের মানুষের কাছে ডিমেনশিয়ার ভয়াবহতা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডিমেনশিয়াকে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলেছে।
ডিমেনশিয়ার বিষয়ে শহরে ও গ্রামে গবেষণা করেছি। ডিমেনশিয়ার সেবার ক্ষেত্রে পরামর্শ দিই। নার্স স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিই। ৪০টি জেলায় আমাদের স্বেচ্ছাসেবক আছে। ডিমেনশিয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করি। কয়েকটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মশালা করেছি। টেলিভিশন, রেডিও, পত্রপত্রিকাসহ প্রায় সব মাধ্যমে আমরা এর ভয়াবহতার বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করছি।
এরই ধারাবাহিকতায় আজকের এ আয়োজন। আমাদের কার্যালয়ের ঠিকানা ৫২/১ রাশেদ খান মেনন রোড (নিউ ইস্কাটন রোড), হাসান হোল্ডিংস, সপ্তম তলা, ঢাকা–১০০০। ০১৭৩৩২২২৯৯৯ নম্বরের আমাদের একটি হেলপ লাইন আছে। এ নম্বরে যাঁরাই ফোন করবেন আমরা তাঁদের সেবায় এগিয়ে আসি। অনেকেই এ নম্বরে ফোন করে সেবা গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশে এখন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় চার লাখ। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা ১৪ লাখ হবে বলে ধারণা করছি। গড় আয়ু যদি ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ে, তাহলে ডিমেনশিয়ার রোগীর হার দ্বিগুণ হয়।
আমাদের প্রস্তাব হলো, সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করে ডিমেনশিয়া–বান্ধব সমাজ (Dementia friendly community) গড়া, চিকিৎসক-নার্সদের সংবেদনশীল হওয়া ও প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য আলাদা বিভাগ চালু করা প্রয়োজন, যেখানে অন্য রোগের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা হয়। ডিমেনশিয়াকে স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া জরুরি।

দীন মো. নুরুল হক:
দীন মো. নুরুল হকআমরা অনেকেই ডিমেনশিয়ার দিকে এগোচ্ছি। কোনো মানুষই মানসিকভাবে এক শ ভাগ সুস্থ না। প্রথম আলোর একটা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে। এ পত্রিকা যখন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, মানুষ সেটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। মানুষ দেখতে চায় প্রথম আলো কী বলে। ডিমেনশিয়া একটা ‘ভুলে যাওয়া’ রোগ। সাধারণত ষাটোর্ধ্ব মানুষের এটা বেশি হয়। আমাদের গড় বয়স এখন সত্তরের ওপরে। গড় আয়ু যত বাড়বে, ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা তত বেশি হবে। মানুষের মস্তিষ্ক শত কোটির বেশি নিউরনে গঠিত। এরা ইলেকট্রিক তারের মতো কাজ করে। এসব নিউরনের মধ্যে ঠিকমতো যোগাযোগ না হওয়ার জন্য মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট হতে পারে। এর জন্য মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগী প্রায় কোনো কাজই নিজেরা সঠিকভাবে করতে পারে না। এমনকি বাড়ি বা বাসার সামনে ছেড়ে দিলেও বাসাটি চিনে বাড়িতে আসতে পারে না। প্রিয় মানুষদের চিনতে পারে না। সবকিছু মুহূর্তেই ভুলে যায়। এ জন্য তারা সম্পূর্ণ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আমাদের দেশের মানুষের দ্রুত গড় আয়ু বাড়ছে। ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার সমস্যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। আমাদের এখন থেকেই এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের নন-কমিউনিকেটেবল কিছু অসুখের ব্যবস্থাপনা আছে। এর মধ্যে রয়েছে হার্টের অসুখ, ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, ক্যানসার, আর্সেনিকোসিস, অটিজম—এসব হচ্ছে নন-কমিউনিকেটেবল ডিজিজ। নন-কমিউনিকেটেবল রোগের মেধ্য ডিমেনশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন আমাদের সঙ্গে বসতে পারে। আমরা জানা-বোঝার চেষ্টা করব, তারা কীভাবে কাজ করে। যে কাজটা আমাদের করা উচিত, তারাই যদি সেটা করে, তাহলে সবাই মিলে কাজটি আরও ভালোভাবে করার উদ্যোগ নিতে পারি।

মনজুরুল আহসান বুলবুল:
মনজুরুল আহসান বুলবুলআমাদের গড় আয়ু বাড়ছে। এর একটা সুবিধা হলো, আমরা অনেক দিন বেঁচে থাকছি, আবার অসুবিধা হলো, শারীরিক অনেক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের এসব মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতি আছে কি না। ডিজি মহোদয় সুখী হওয়ার প্রসঙ্গ বললেন। কিন্তু কে কীভাবে সুখী হয়, সেটি আসলে একটি আপেক্ষিক বিষয়।
কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে একটি কমিটি হয়েছিল, আমিও সে কমিটিতে ছিলাম। প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা হলো, তোমরা কি সুখী? সবাই বলল, হ্যাঁ, আমরা সুখী। তখন তাদের প্রশ্ন করা হলো, তোমরা কি যানজট, লোডশেডিং, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার পদ্ধতি ইত্যাদিতে সুখী? সবাই বলল, ‘না’। অর্থাৎ সুখের কোনো সূচকেই তারা সুখী না। অথচ বলছে সুখী।
তাই কে যে কখন সুখী বা অসুখী, এটা বলা খুব কঠিন। দেশে এখন তিন লাখের বেশি ডিমেনশিয়া রোগী আছেন। এ রোগ অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক নাকি রাজনৈতিক; কী কারণে হয়, সেটা জানা দরকার। আমরা হয়তো অনেক কিছু জানি না। ডিমেনশিয়ার বিষয়ে আমরা অনেকেই ভালোভাবে কিছু জানি না। এ বিষয়ে সবার জানা ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাঁরা থাকেন, তাঁরা সাধারণত বেশি বয়সের হন। তাঁদের যদি বোঝানো যায়, এটা আপনার বিষয়, আপনিও যেকোনো সময়ে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, তাহলে হয়তো তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে আসবেন। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রেসক্লাবে সাত শ জন সদস্য আছেন। তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। তাই প্রেসক্লাবে এটা নিয়ে একটা প্রচার করা যেতে পারে। এতে দুটো কাজ হবে: প্রেসক্লাবের সদস্যদের মধ্যে একটা সচেতনতা সৃষ্টি হবে, কেউ কেউ হয়তো গণমাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগ নেবেন।
ডিমেনশিয়া সম্পর্কে মানুষকে জানানো ও সচেতন করার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। তাই কীভাবে এর সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত করা যায়, তার একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কাজী দীন মোহাম্মদ:
কাজী দীন মোহাম্মদ মোটাদাগে ডিমেনশিয়া বলতে বোঝায় স্মরণশক্তি কমে যাওয়া। মানুষের মস্তিষ্কে এক ইঞ্চি পুরু খাতার মতো স্থান আছে। মানুষ প্রতিদিন যা দেখে, যা চিন্তাভাবনা করে, এ খাতায় তা লিপিবদ্ধ করা থাকে। ফলে আমরা যা দেখি, তা মনে রাখতে পারি। ডিমেনশিয়া রোগীরা কেন ভুলে যান? তাঁর ‘এক ইঞ্চি খাতা’ অনেক সময় শুকিয়ে এক সেন্টিমিটার হয়ে যায়। এ জন্য তিনি যা দেখেন, তা আর খাতায় লিখে রাখতে পারেন না। তাই একটু পরেই ভুলে যান।
অথচ তিনি ২০ থেকে ২৫ বছর আগে কী হয়েছিল, তাঁর সবটাই মনে রাখছেন। নির্ভুলভাবে মুক্তিযুদ্ধের বছরের ঘটনা বলছেন। একবার কাউকে দেখলে সেটা মস্তিষ্কে লেখা হয়ে যায় বলেই একবার দেখা অনেক আগের কাউকেও আমরা চিনতে পারি।
বিশ্বে এখন চারটি ঘাতক ব্যাধি আছে—ক্যানসার, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়া। শুরুতে ধরা পড়লে ক্যানসার, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া ও স্ট্রোক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু ডিমেনশিয়া নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার যতগুলো কারণ আছে, তার ৯০ শতাংশই আমরা জানি না। বিশ্বের কেউ জানে না কেন ডিমেনশিয়া হয়। কারণ না জানলে কীভাবে এটা প্রতিরোধ করব? ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিগ্যান মারা যান ডিমেনশিয়ায়।
আমাদের থেকে উন্নত বিশ্ব অনেক বেশি চিন্তিত। তাদের দেশে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ডিমেনশিয়া ও ক্যানসারের কারণ গবেষণায় বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অনুরোধ করব, তিনি যেন ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেন। কারণ, তাঁর বা আমাদের যে ডিমেনশিয়া হবে না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই নিজেদের স্বার্থেই আমাদের ডিমেনশিয়ার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।
ডিমেনশিয়া রোগীদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অন্যের সহযোগিতা নিয়ে তাঁদের চলতে হয়। তাই ছোটদের মতো আদর-ভালোবাসা দিয়ে তাঁদের দেখে রাখতে হয়। এখন পরিবারে সমাজে এ ধরনের রোগীদের কীভাবে দেখে রাখা হবে, সেটা একটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ।
এ রোগের কোনো কার্যকর ওষুধ এখনো নেই। কিছু মূল্যবান ওষুধ আছে। এর মাধ্যমে এ রোগ সারার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন শিশুর মতো তাকে দেখভাল করে রাখাই হচ্ছে তাঁর চিকিৎসা। এটি যে যতভাবে করতে পারবে সে রোগী তত ভালো থাকবে।

ফওজিয়া খানম:
ফওজিয়া খানম আমার স্বামী মোজাফ্ফর হোসাইন। তাঁর বয়স এখন ৬০ বছর। তিনি সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পরও যেন অলস বসে না থাকেন। আরও ভালো কোনো কিছু করতে পারেন।
এ জন্য পড়াশোনা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষটা এক অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। ২০০৭ সালে তাঁর এই সমস্যা দেখা দেয়। অফিসের কাজ ঠিকমতো গুছিয়ে করতে পারছিলেন না। সব ক্ষেত্রে এলোমেলো ভাব লক্ষ করা যায়।
একবার একজন ২০ হাজার টাকা দিয়ে বলল, আমার স্বামীর কাছ থেকে ধার নিয়েছিলেন। ইদানীং তিনি কাউকে বিশ্বাস করছেন না। সবাইকে ভুল বুঝছেন। ঘরের জানালা খুলে রাখলে বলেন, আমকে কেউ গুলি করতে পারে।
ভারতে নিয়েছি। সেখানে বলেছে, তাঁর ডিমেনশিয়া। দেশের
চিকিৎসকেরাও একই কথা বলেছেন। এখন এমন অবস্থা যে তিনি কিছুই করতে পারেন না। তাঁর সব কাজই আমাকে করতে হয়। অন্যদের জন্য বলব, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও শিশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। একটি শিশুকে যেভাবে আদর-যত্ন করতে হয়, ডিমেনশিয়া রোগীকে ঠিক একইভাবে সেবা-যত্ন করতে হয়। সঠিক সেবা-যত্ন, সহযোগিতা ও ভালোবাসা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার আছে বলে মনে হয় না।
সামনুন এফ তাহা:
সামনুন এফ তাহাদেশে এখন ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক ডিমেনশিয়া রোগী আছে। কিন্তু সেই তুলনায় জেরিয়াট্রিক চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। ডিমেনশিয়ার বিষয়ে এখনো অধিকাংশ মানুষ জানে না। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
গ্রামে এখনো মাঝেমধ্যে দেখা যায়, কোনো একজন নারী বা পুরুষকে পাগল পাগল বলে ধাওয়া করা হচ্ছে। আসলে তাঁর হয়তো মাথা খারাপ নয়। ডিমেনশিয়া। কিন্তু ডিমেনশিয়া রোগীর পরিবার ও সাধারণ মানুষ না জানার জন্য এমনটি হচ্ছে।
ডিমেনশিয়া রোগীর চিকিৎসকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব শ্রেণির চিকিৎসকদের পাঠ্যসূচিতে ডিমেনশিয়া রোগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। চিকিৎসকেরা এ বিষয়েও জানতে চান। হেল্পএইজের সহযোগিতায় আমরা গিয়েছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে। সেখানে চিকিৎসকদের ডিমেনশিয়ার বিষয়টি বললাম। তাঁরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলেন।
কিন্তু সমস্যাটা হলো, ডিমেনশিয়া একটি আধুনিক রোগ। ডিমেনশিয়ার বিষয়ে বইপত্র বা তথ্য-উপাত্ত খুব বেশি নেই। তবে দু-একটা পরীক্ষা, আর কিছু প্রশ্ন করলেই মোটামুটি বোঝা যাবে কোনো রোগী ডিমেনশিয়ার দিকে যাচ্ছেন কি না এবং ডিমেনশিয়া হলে রোগীর কীভাবে সেবা-যত্ন নিতে হয়—এসব বিষয় সাধারণ চিকিৎসকদের শেখানো যেতে পারে। এটা কঠিন কোনো কাজ না। গড় আয়ু বাড়ার কারণে দিন দিন ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। তাই এখন থেকে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষদের এ বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে জানাতে হবে।
চিকিৎসার মাধ্যমে ডিমেনশিয়া রোগীকে সম্পূর্ণ ভালো হয়তো করা যায় না, কিন্তু ডিমেনশিয়ার গতিকে থামিয়ে দেওয়া যায়। ডিমেনশিয়া মানে ভুলে যাওয়া। এখন বিভিন্ন কারণে মানুষ ভুলে যায়। যেমন: ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড ও থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে মানুষ ভুলে যেতে পারে। তাই স্ক্রিনিং, রক্ত পরীক্ষা করলে কোনো রোগীর ডিমেনশিয়া কি না, সেটা মোটামুটি বোঝা যাবে ও কিছু চিকিৎসা দেওয়া যাবে, যেটা ডিমেনশিয়ার গতিকে ধীর করে দেবে। এসবের চিকিৎসা যেকোনো চিকিৎসক করতে পারেন। খুব প্রাথমিক অবস্থায় ডিমেনশিয়া ধরা পড়লে এবং সেবা-যত্ন ও কিছু চিকিৎসার আওতায় থাকলে ডিমেনশিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করবে না।

শাকিলা নার্গিস খান:
শাকিলা নার্গিস খান আমার শ্বশুর অত্যন্ত প্রগতিশীল স্বাধীনচেতা একজন মানুষ ছিলেন। নিজের মেয়ে না থাকায় আমাকে মেয়ের মতোই মনে করতেন। পিএইচডি করার জন্য বৃত্তি পেলাম। এ খবরে তিনি অনেক খুশি হয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডে চলে যাই পিএইচডি (উচ্চতর ডিগ্রি) করতে। আমার পড়াশোনা শেষে প্রায় সাড়ে তিন বছর পর তিনি আমরা কাছে চলে আসেন। কিন্তু বাড়িতে তাঁকে যেভাবে রেখে এসেছিলাম, তার থেকে অনেক পরিবর্তন। তাঁর কিছু আচরণ আমাকে এখানে বিব্রত করল।
শ্বশুরকে নিয়ে দেশে এলাম। তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হলেন। অনেক চিকিৎসাও করা হলো। একবার তাঁর ডায়াবেটিসের মাত্রা হলো ৪৫। এ অবস্থায় তিনি চিকিৎসায় সেরে উঠলেন। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল, তাঁর আর কোনো কিছুতে মনোযোগ থাকছে না।
তিনি স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই অসংগত কথা বলছেন। আমরা সবাই বিব্রত হচ্ছি। প্রায় ছয় মাসের মতো তাঁর প্রচণ্ড রাগ ছিল। তিনি মাঝরাতে উঠে বসে থাকেন। জানালা-দরজা খুলে রাখেন। সবাইকে ডাকাডাকি করেন। তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো হলো। কোনো কিছুতে খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না।
একসময় কাজী দীন মোহাম্মদ স্যারকে দেখালাম। তিনি বললেন, মারাত্মক আলঝেইমারস। আমাদের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর হলো তখন, যখন তিনি আর কাউকে চিনতে পারছেন না। তাঁর সব প্রিয় মানুষ আশপাশে আছে, কিন্তু তিনি কাউকে চিনতে পারছেন না। এরপর নিজে আর কিছুই করতে পারেন না, সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হলেন।
এরপর তিনি মানুষ দেখলে ভয় পাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু আমরা যারা তাঁর খুব কাছের, তাদের দেখলে তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।
বাসার সবার প্রচণ্ড সহযোগিতা পেয়েছি। আমাদের বাসাটাই একটা ছোট হাসপাতালের মতো করা হলো। চিকিৎসার প্রায় সবকিছু বাসায় করার সুযোগ ছিল। তারপরও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হলো না।
স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশনের আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। তাদের সহযোগিতার জন্যই আমার শ্বশুর মৃত্যুর দুই মাস আগ পর্যন্ত হাঁটতে পেরেছিলেন। একজন শিশুকে যেভাবে সেবা-যত্ন করা হয় দীর্ঘ সময় ধরে, আমরা সেভাবে তাঁর সেবা-যত্ন করেছি।

নির্ঝরিনী হাসান:
নির্ঝরিনী হাসান ১৯৯১ সাল থেকে আমরা বাংলাদেশে কাজ করছি। ২০০৯ সালে একটি আঞ্চলিক দপ্তর খুলি। ২০০৯ সাল থেকেই প্রবীণদের নিয়ে কাজ শুরু করি। দেখলাম, প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যাটাই বড়। অস্ট্রেলিয়াসহ কিছু উন্নত দেশে প্রবীণদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো ডিমেনশিয়া। ডিমেনশিয়া রোগীদের পাশে থেকে সেবা করা পরিবারের মানুষদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
২০১৩ সালে স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে হেল্পএইজ ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ আলঝেইমার অ্যাসোসিয়েশন ও স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলে বাংলাদেেশ একটি ডিমেনশিয়া অ্যাকশন অ্যালায়েন্স গঠন করা হয়েছে। আমাদের প্রধান কাজ মানুষকে সচেতন করা।
ডিমেনশিয়ার ওপর আমরা একটি প্রতিবেদন তৈরি করছি। আগামী নভেম্বরে এটি প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে। আমাদের প্রতিবেদনের মূল কথা হলো, ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলো কী, এটা হলে কী করতে হবে ইত্যাদি বিষয় বিস্তৃতভাবে সবাইকে জানানো। গ্রামের চিকিৎসকেরাও যেন খুব সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন কোনো রোগী ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত কি না। আমরা ডিমেনশিয়া রোগীর সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগের বিষয়টিও ভাবছি। আমাদের সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য, একটি ডিমেনশিয়া-বান্ধব সমাজ গড়া। এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে মানুষকে অনেক সচেতন করে তুলতে পারব।

এ এস এম আতীকুর রহমান:
এ এস এম আতীকুর রহমানডিমেনশিয়াকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। এটা একটা বার্ধক্যজনিত রোগ। একে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। প্রথম আলোকে ধন্যবাদ যে আপনারা প্রবীণদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। রহমান জিলানীকে ধন্যবাদ যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও বাংলাদেশের প্রবীণদের কথা ভেবেছেন।
গাজীপুরে আবদুল জাহিদ মুকুল প্রবীণদের জন্য ওল্ডহোম করছেন। অনেকেই জানেন না প্রবীণেরা কত কষ্ট করে জীবন যাপন করছেন। যাঁদের ডিমেনশিয়া হয় পরিবার, প্রতিষ্ঠান কেউ তাঁদের পাশে থাকতে চায় না। এরা অমানবিক অবস্থায় জীবন যাপন করেন।
১৯১২ সালের লুনেসি আইন আছে। এ আইনে কারও মধ্যে অসংলগ্নতা দেখা দিলে প্রথমেই তাঁর চাকরি ও ভোটের অধিকার চলে যাবে। অথচ এঁদের কষ্টটা কেউ বুঝবে না, সারিয়ে তোলার উদ্যোগ নেবে না। দেশে এখন প্রবীণের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ। ২০২৫ সালে হবে ২ কোটি, ২০৫০ হবে ৪ কোটি ৫০ লাখ, এভাবে বাড়তেই থাকবে। এঁদের মধ্যে কত শতাংশের ডিমেনশিয়া হবে আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?
স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশনকে অনেক ধন্যবাদ যে তারা প্রথম আলোর মতো একটি গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে এসেছে।
আমরা প্রিন্ট মিডিয়াকে অনুরোধ করব, আপনার পত্রিকায় অনেক বিষয় নিয়ে আসেন। মাসে অন্তত ডিমেনশিয়া নিয়ে এক দিন লিখুন। গণমাধ্যম ছাড়া ব্যাপক আকারে সচেতনতার কাজটি করা আসলে কঠিন।
৩৫ বছর পড়াশোনা করেছি প্রবীণদের নিয়ে। কিন্তু এখনো আমরা বৃদ্ধ মা–বাবার আচরণ দেখলে মনে হয় কিছুই পড়িনি। এত অদ্ভুত আচরণ তাঁরা করেন।
আমাদের কোনো সমস্যা হলে পশ্চিমারা কী করেছে ও দাতা সংস্থা কী দেবে, সেদিকে তাকিয়ে থাকি। আমি মনে করি, আমাদের নিজেদের ভেতর থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে এত বিশাল পরিমাণ ডিমেনশিয়া রোগীকে সাহায্য করতে পারব না।

আশফাকুজ্জামান চৌধুরী:
আশফাকুজ্জামান চৌধুরীপ্রবীণদের অনেক কষ্টের কথা এখানে শুনলাম। নিজেও ৩৫ বছর কাজ করছি। অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখেছি। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে বৃদ্ধ হওয়া মানে ডিমেনশিয়া হওয়া নয়। সবার ডিমেনশিয়া হবে না। আবার কার হবে, সেটাও আমরা জানি না।
একটা বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে বুঝব ডিমেনশিয়া হয়েছে। এঁদের আচরণের একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। শিশুদের মতো অভিমান করেন। খুব সামান্য ব্যাপারে রেগে যান। ভিটামিনের ঘাটতি, অতিরিক্ত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের অকার্যকারিতা, হেপাটাইটিস, ট্রমা ইত্যাদি কারণে ডিমেনশিয়া হতে পারে।
ডিমেনশিয়া পরীক্ষার জন্য স্ক্রিনিং পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। মিনি মেন্টাল পরীক্ষায় যদি দেখা যায় কারও স্কোর ২৫-২৬-এর নিচে, তাহলে তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধরা হবে। স্কোরের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ, মধ্যম ও মারাত্মক কার কোন মাত্রার ডিমেনশিয়া, সেটা বোঝা যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় যাঁরা আছেন, তাঁদের ওষুধের মাধ্যমে সারানোর চেষ্টা করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, কাকে কতটা ভালো পরিবেশে রাখা যায়, ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে এটি খুব জরুরি।
ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে আদর-ভালোবাসা ও সেবা-যত্নের কোনো বিকল্প নেই। আমি ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিই, এই রোগটার জন্য তিনি দায়ী নন। শরীরচর্চা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে ব্যস্ত রাখা ও হাসিখুশি থাকা জরুরি।

রহমান জিলানী:
রহমান জিলানী৩০ থেকে ৪০ বছর আগে গ্রামে কার ডায়াবেটিস হয়েছে, আমরা জানতাম। এখন কিন্তু ঘরে ঘরে ডায়াবেটিস। ডিমেনশিয়াও ডায়াবেটিসের মতো ধেয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে দ্রুতগতিতে ডিমেনশিয়া বাড়তে থাকবে।
বিদেশে এটা নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। শারীরিক-মানসিক চাপ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি কারণের কথা বলা হয়। কিন্তু এর কোনোটাই ডিমেনশিয়ার কারণের জন্য নিশ্চিত না। ডিমেনশিয়া রোগীদের কে সহযোগিতা করবে? স্বামী স্ত্রীকে, না স্ত্রী স্বামীকে? এক-দুজনের পক্ষে এঁদের সেবা দেওয়া সম্ভব না। এটা একটি নিবিড় পরিচর্যার বিষয়।
প্রতিটি কমিউনিটিতে তরুণ সমাজ আছে। ডিমেনশিয়া রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য তাঁদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি কমিউনিটির তরুণেরা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে সবার পক্ষে এ রোগের মোকাবিলা করা সহজ হবে।
গণমাধ্যমকে এখানে একটা বড় ভূমিকা রাখতে হবে। অধিকাংশ মানুষ এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছু জানে না। মানুষকে জানাতে হবে ডিমেনশিয়া কী। চিকিৎসা করার মতো ওষুধ তো আবিষ্কার হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে। কারণ, এখানে শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা আছে। নিশ্চয়ই একদিন ওষুধ আবিষ্কার হবে।
ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে বোঝাতে হবে যে আপনার জন্যই আপনাকে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। তাই এ ক্ষেত্রে এখনই একটি আইন পাস করে নেওয়া জরুরি।

এম আর খান:
এম আর খানপ্রথম আলো ও স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন সময়োপযোগী গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার জন্য ঠিক করেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ। আমাদের, যাদের বয়স ৬০ বছর পার হয়েছে, তারা বৃদ্ধ।
বয়স্ক মানুষদের জন্য সরকার কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু করেছে। যেমন রাষ্ট্রপতি ষাটোর্ধ্ব মানুষদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করেছেন। মাতা-পিতা, ভরণ-পোষণ আইন সংসদে গৃহীত হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
স্বাস্থ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রবীণদের সুবিধা দানের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রবীণ ফাউন্ডেশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বিধবাদের ভাতা প্রদান। প্রবীণদের জন্য সরকার এ কাজগুলো করেছে, করছে।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের জন্য করণীয় হলো, ডিমেনশিয়া-বান্ধব সমাজ গঠন করা, ডিমেনশিয়া রোগীদের স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা করা, তাঁদের জন্য বিশেষ সহায়তামূলক আইন তৈরি করা, ডিমেনশিয়া রোগীদের যথাযথ সম্মান ও সেবা প্রদানের জন্য গণমাধ্যমগুলোর প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতন করা ইত্যাদি।
ইন্দোনেশিয়ায় ট্রাফিক সিগন্যালে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ডিমেনশিয়ার বিষয়ে তথ্য প্রদান করা হয়। এটা অতি অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে সচেতন করে।
যুক্তরাজ্যের পাঠ্যসূচিতে ডিমেনশিয়া অন্তর্ভুক্ত আছে। সেখানে ব্যাংকে ডিমেনশিয়া রোগীদের টাকা তোলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে।
ডিমেনশিয়া রোগীদের মধ্যে যাঁদের আত্মীয়স্বজন নেই, তাঁদের জন্য কমিউনিটি সেবার ব্যবস্থা করা দরকার।
শেষে বলব, ডিমেনশিয়া রোগীরা যাতে আর দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন, সে জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ডিমেনশিয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশা করি।
আব্দুল কাইয়ুম: দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য গড় আয়ু বাড়ছে। ডিমেনশিয়া সাধারণত বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের রোগ। তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিমেনশিয়ার কারণ ও চিকিৎসা, দুটো বিষয় এখনো মানুষের প্রায় অজানা। কিন্তু সঠিক পরিচর্যা তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে কীভাবে তাঁদের জন্য আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সেটি গুরুত্ব সহকারে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

যাঁরা অংশ নিলেন

এম আর খান : জাতীয় অধ্যাপক
দীন মো. নুরুল হক : মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা
কাজী দীন মোহাম্মদ : পরিচালক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
রহমান জিলানী : প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাজ্য
জীবন কানাই দাস : কান্ট্রি ডিরেক্টর, স্যার উইলিয়াম বেভারিজ ফাউন্ডেশন
এ এস এম আতীকুর রহমান : অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শাকিলা নার্গিস খান : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সামনুন এফ তাহা : অধ্যাপক, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন
মনজুরুল আহসান বুলবুল : প্রধান সম্পাদক, এটিএন বাংলা
নির্ঝরিনী হাসান : চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ ডিমেনশিয়া অ্যাকশন অ্যালায়েন্স ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেল্পএইজ ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ
আশফাকুজ্জামান চৌধুরী : সাবেক উপদেষ্টা, সাইকিয়াট্রিস্ট, বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস
ফওজিয়া খানম : গৃহিণী
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

 

                                                                                                                                                    প্রথম আলো বৃহস্পতিবার, ২২অক্টোবর ২০১৫

Template Settings
Select color sample for all parameters
Orange Dark_Green Crimson Green_Yellow Indigo Maroon Medium_Violet_Red tomato
Background Color
Text Color
Select menu
Google Font
Body Font-size
Body Font-family
Direction
Background Color
Scroll to top